অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দৃশ্যমান। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পলাতক থাকা একজন ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে। এ ছাড়া ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান, সরকার গঠন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ইস্যুতেও।
আশঙ্কার জায়গাটি এখানে ভিন্ন। আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে হটানোর পর সারাদেশে জিহাদিদের আকস্মিক উত্থান ঘটে। এখানে যুক্ত হয় শরিয়াহ আইন, খেলাফত প্রতিষ্ঠা ও মানুষকে নিয়ন্ত্রণের গল্প। যে গল্পের পুরোটা ঘিরেই এখানে ধর্ম ইসলামকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থার বিস্তৃতি।
বাংলাদেশের প্রশাসনসহ সেনাবাহিনীর ভেতরে জামায়াতের মতাদর্শে বিশ্বাসী জিহাদি গোষ্ঠী, জিহাদি জঙ্গিরা বাংলাদেশকে শাসন বানানোর জন্য আফগানিস্তানের মডেলের মাধ্যমে এ দেশের মানচিত্র ও নারীদের স্বাধীনতা, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং সকল মুক্ত মত ও চিন্তার স্বাধীনতার ওপর কালো কাপড়ের আবরণ পরিয়ে দিতে চায়। যথারীতি নানা জায়গা থেকে এসব উগ্রবাদীরা গলা উঁচু করে হুঙ্কার দিয়ে যাচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকায়। এখানেই গণতন্ত্রের পরাজয়। যেখানে ধর্মের আদর্শের সাথে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে ভিত্তি, এর অবস্থায় তির্যক।
ইসলামী মৌলবাদে বিশ্বাসী এ গোষ্ঠীরা ১১ দলীয় ঐক্যজোটের ব্যানারে সকল উগ্রবাদী ইসলামপন্থীদের নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশকে একটি জিহাদিস্থান বানাতে চায়। যেখানে ভিন্নমত, ধর্ম, বর্ণ ও যৌন পরিচয় এবং মুক্তমত প্রকাশের সকল ধরনের প্রগতিশীল মানুষদের জীবন ব্যবস্থায় ধর্মকে দিয়ে বিচারের একটি উন্মুক্ত স্বেচ্ছাচারী, বায়বীয় আদালত প্রতিস্থাপিত হবে। যেখানে মানুষের অধিকার, মানবাধিকারসহ নারী ও সংখ্যালঘু সকল মানুষকে এক ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।
আজকের বর্তমান বাংলাদেশে জিহাদি গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামী, খেলাফতে মজলিশ, হেফাজতে ইসলামের চরমপন্থীরা ইসলাম ও কোরআনের আইন হেফাজতের নামে তাদের সংঘবদ্ধ নেতৃত্বে বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রকাশ্যে হিন্দু সংখ্যালঘু বলে চিহ্নিত করে, ধর্ম অবমাননার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে; বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে; মা-বোনদের বিবস্ত্র করে সম্ভ্রমহানি ও নির্যাতন করা হচ্ছে। যেন ধর্মের ফোবিয়া গ্রাস করেছে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, বাক্স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে রক্তের হোলিখেলায় মত্ত এই জিহাদিরা।
দেশে অসংখ্য উসকানিমূলক জাল তৈরি করা হয়েছে, যার যেন কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর প্রতিনিয়ত জুলুম, অত্যাচার, খুন, জবরদখল, উচ্ছেদ করে সম্পত্তি দখল করা হচ্ছে। মুক্তমনা, প্রগতিশীল ও নাস্তিক গোষ্ঠীকে করা হয়েছে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। এদের হত্যা করতে পারলেই যেন বেহেশত নিশ্চিত। বেহেশতে যাওয়ার নেশা আর হুরের সঙ্গে মিলনের লোভাতুর কামনা জেগে উঠেছে এসব জিহাদি গোষ্ঠীর অন্তরে।
ধর্মের নবী মহান একই সাথে মুমিন মুসলমানের আল্লাহও। যিনি তাঁর উম্মতে মুহাম্মদীদের ৭২ হূরের সুসংবাদ ও অগণিত নিয়ামতের সুসংবাদ নবীর স্বরচিত গ্রন্থ কোরআনে লিপিবদ্ধ করেছেন।
১৪০০ বছর আগের কোরআন, কালো পতাকা, মৌলবাদীদের বুনো উল্লাস আর কালো জঙ্গি পতাকার উত্তোলন—এসব এ দেশে রুখে দিতে হবে। বাংলাদেশ কি জামায়াতি তালেবানদের হাতে চলে যাবে, নাকি আমরা ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলব? সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে।
এমন বাস্তবতার মুখোমুখি যখন দাঁড়িয়ে বর্তমান বাংলাদেশ, সেখানে মুসলমানের শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যদি জিহাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়, এ আধুনিক যুগেও ধর্মের পালের মুসলমানেরা উন্মুক্ত তরবারি ও মাথার পাগড়ি লম্বা জোব্বা নিয়ে গ্রেনেড বোমা নিয়ে ছুটে আসে, নিরীহ মানুষ হত্যা করে; সেখানে ধর্ম ইসলামের মতো একটি জিহাদি ধর্মের অবসান অত্যাবশ্যকীয়।