শিরোনাম :
ধর্মচর্চা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা—ধর্মের আড়ালেই অধর্ম আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের উত্থান: শরিয়াহ আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্ন বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক সমীকরণে জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে উদ্বেগ শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকার মুসলমানের জন্য বৈধ! মুসলমান, মৌলবাদী ও জঙ্গি—এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই ইসলামে নারীদের পর্দা প্রথার উৎস ধর্ম ইসলামের বর্বরতা: নবী, কোরআন ও যৌনতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন বাংলাদেশে জিহাদের উন্মাদনা: ধর্মান্ধতার উত্থানে মানবিক রাষ্ট্রের সংকট ইসলামপন্থীদের উত্থানে বাংলাদেশে উন্মাদনা: তালেবানি রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন এলজিবিটিকিউ মানুষের আত্মপরিচয়: রংধনুর মতো বৈচিত্র্যময় ও বর্ণিল
অনুসন্ধান করুন:
|
আমাকে অনুসরণ করুন:
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন

এলজিবিটিকিউ মানুষের আত্মপরিচয়: রংধনুর মতো বৈচিত্র্যময় ও বর্ণিল

কামরুল ইসলাম
প্রকাশিত : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

পৃথিবীর পরিমণ্ডলে ভালোবাসা কি অপরাধ?

যে কেউ এমন প্রশ্নের বিপরীতে কিছুটা হাস্যরস করবে। পাশাপাশি কোনো সমবয়সী নারীর প্রতি কোনো পুরুষ হয়তো একটু আড়চোখে দেখবে; এর বিপরীতে নারীও কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে নিজেকে প্রকাশ করবে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি এমন সূক্ষ্ম ভালোবাসার প্রকাশ, আকর্ষণ, অভিব্যক্তি প্রকৃতিতে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখা হয়।

কিন্তু প্রশ্নের বিপরীতে প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা—এমন কিছু তৈরি হয় যখন একজন পুরুষ অন্য একজন পুরুষের দিকে; একজন নারী অন্য একজন নারী একই দৃষ্টিতে দেখবে, নিজেকে প্রকাশ করতে চাইবে। এমন নিয়মকে অস্বাভাবিক মনে করা হয় বাংলাদেশের একান্নবর্তী ধর্মভিত্তিক সমাজব্যবস্থায়। ধর্ম এখানে অদৃশ্য কারাগার। প্রাত্যহিক জীবনে মানুষের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, যাপিতজীবন—সব কিছুরই নিয়ন্ত্রক এখানে ধর্ম ইসলাম।

এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষ ভিন্ন এক পরিচয় নিয়ে বেড়ে ওঠে। এটিকে একটি বৈচিত্র্যময় পরিচয় হিসেবে দেখা হয়, রঙধনুর মতো। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবারের বাইরেও ধর্ম ইসলাম জীবন সম্পর্কে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। এদের ভুলভাবে উপস্থাপন, বিকৃত উপস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় আইন ও মৌলিক অধিকার, চিকিৎসাব্যবস্থা সহ নিজেদের আত্মপ্রকাশের এক বঞ্চনার সুদীর্ঘ ইতিহাস এখানে নিস্তরঙ্গ বইছে দশকের পর দশক। জীবনের শঙ্কা, ধর্ম ইসলামের রূঢ় আইনকানুনের সাথে মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থার দ্বারা আক্রান্তের এক অজানা ভয়ের দীর্ঘ সংস্কৃতি; এসব কিছুই একই মানবাধিকারভিত্তিক জীবনব্যবস্থাকে সংকীর্ণ করেছে। সেখানে এসব মানুষেরা জীবন অতিবাহিত করেন ভয়, শঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের দুইজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ ওঠায় তাদের সিট বাতিল করেছে প্রশাসন।

(সূত্রঃ বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা)

বাংলাদেশে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; যেখানে সবচেয়ে উদারনৈতিক মানুষ তৈরি হয়। কিন্তু সেখানেও এই বৈরিতা ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষের জীবনবোধ সম্পর্কে এক ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

বাংলাদেশের আইনেও ‘সমকামিতা’কে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। রাষ্ট্র, আইন এবং ধর্ম ইসলামের উগ্রবাদী শরিয়াহ আইনের আওতায় এ ধরনের মানুষদের হত্যাযজ্ঞ মনে করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ধর্ম ইসলামের অনুসারী নবী মুহাম্মদের উম্মতেরা যৌন পরিচয়ে ভিন্নতা থাকা এসব মানুষদের হত্যাকে বেহেশত লাভ ও ধর্মের মান রক্ষার উপায় হিসেবেই দেখে। ইসলামের চার মাযহাব, সাহাবী ও আলেমগণ এমন হত্যাকে অনুমোদন দেয়।

ইসলাম ধর্মের শুরু থেকেই নারী ও শিশুদের প্রতি ইসলামের আচরণ ছিলো অবমাননাকর। যুদ্ধ, হত্যা, এবং ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও যৌন পরিচয়ের মানুষদের জন্য ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষার মধ্যেই ছিলো এক ভীতিকর পরিবেশ। মিশে ছিলো বর্বরতা। নবী মুহাম্মদ তাঁর যে ইসলামিক শিক্ষা পথ প্রদর্শনে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে প্রচার ও দেখিয়ে গিয়েছিলেন, তা ছিলো মূলত সভ্যতা বিবর্জিত।

তিনি বলছেন;

“তোমরা যাকে লুত সম্প্রদায়ের কৃতকর্ম করতে দেখবে, তাকে এবং যার প্রতি তা করা হয়েছে, উভয়কেই হত্যা করো।” (আবু দাউদ, হজ্জ/৪৪৬২)

অর্থাৎ ধর্ম ইসলাম, পৌরাণিক মানবরচিত গ্রন্থ কোরআনও এলজিবিটিকিউ মানুষদের যৌন পরিচয়ের এ স্বাভাবিক বিষয়কে স্বীকৃতি দেয় না।

এমনকি ১৮৬০ সালের বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী, প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যেকোনো যৌন মিলন, যেমন সমকামিতা বা পায়ুসঙ্গম, একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এই আইন অনুযায়ী, ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে, সরকার ইসলামী দেশগুলোর মতো ‘তৃতীয় লিঙ্গ’কে স্বীকৃতি দিয়ে ৩৭৭ ধারা বাতিল করেনি। বরং সরকার বলতে চায় যে, আমরা তৃতীয় লিঙ্গকে স্বীকৃতি দিয়েছি কিন্তু সমকামিতাকে অবৈধ করেছি। ৩৭৭ ধারা বাতিল হবে না।

যে ধর্ম ইসলাম, কোরআন ও যে রাষ্ট্রের আইন মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি দেয় না; সেটি কী করে আসমানি গ্রন্থ কিংবা সে আইন কী করে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারে? এই কোরআন এবং রাষ্ট্রের আইনের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকারের জন্য রুখে দাঁড়াতে হবে। এমন আইন ও কোরআনের বিধান ও ব্যবস্থা মানুষের উচিত ছুড়ে ফেলা।

এলজিবিটি সম্প্রদায় এবং লিঙ্গ সংখ্যালঘুদের স্বীকৃতির জন্য লড়াই ধর্মপাল মুসলমান ও রাষ্ট্রের আইনের অনিয়মের  বিরুদ্ধে। ২০০৯ এবং ২০১৩ সালে, বাংলাদেশ সংসদ ৩৭৭ ধারা বাতিল করতে অস্বীকার করে। যেখানে রাষ্ট্রের আচরণ অমানবিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

ভিন্ন যৌন পরিচয় ও সমকামিতার মতো বিষয়কে বৈধতা দিতে হবে। ধর্ম ইসলাম ও নবী মুহাম্মদের অনুসারী ধর্মের আলেম, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মশিক্ষার অন্তরালে ছোট ছোট বাচ্চাদের মসজিদ, মাদ্রাসায় আল্লাহর উপস্থিতিতে নারায়ে তাকবির বলে আল্লাহর নামে বলাৎকার করছে। এরা দ্বীন ইসলামের সমকামী। এরপর শরিয়াহ আইনের নামে, ধর্মের নামে দায়মুক্তি দেওয়া হয় এসব শিশু নির্যাতনকারীদের।

সমকামিতা অপরাধ না। মুসলিম সমকামীর সংখ্যাই অত্যধিক। শুধুমাত্র প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ভয়, লজ্জা ও সামাজিক পরিবেশের কারণে এরা পরিচয় প্রকাশে হীনমন্যতায় ভোগে। যার কারণে মসজিদ, মাদ্রাসায় এসব বলাৎকারের ঘটনা ঘটছে।

ভিন্ন যৌন পরিচয়ের এসকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় আইনে ৩৭৭ ধারা বাতিলসহ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ধর্মের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সাথে উগ্রবাদ, মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে আসছে যে ধর্ম ইসলাম, সে ধর্মকে প্রতিহত করা ও নবী মুহাম্মদের স্বরচিত কাব্যগ্রন্থ কোরআনের আইনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ থেকে বাংলাদেশে যে রাষ্ট্র, সমাজ ও পারিবারিক ব্যবস্থা—এ শৃঙ্খল ভেঙে দিতে হবে। এরপরই হয়তো রঙধনুর রঙ মানবাধিকার ও মানুষের অধিকার নিয়ে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত হবে।


আরও পড়ুন